ঢাকা, আজ সোমবার, ২ আগস্ট ২০২১

চাই বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৫ ০৮:৩০:২৭ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৪ ২০:৫৭:১৭

একুশের চেতনা হচ্ছে মাতৃভাষার পক্ষে দাঁড়ানোর চেতনা। যেটি ঘটেছিল তা হচ্ছে- বাংলা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছিল না রাষ্ট্রীয়ভাবে। ফলে রাষ্ট্রভাষার দাবিতে যে আন্দোলন, তা রাষ্ট্রের বিপক্ষের আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ রাষ্ট্র বাংলা ভাষার বিরোধী অবস্থান নিয়েছিল। ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে ভাষার প্রতি আমাদের ভালোবাসা, আমাদের দেশপ্রেম প্রতিষ্ঠিত হল। গণদাবির মুখে শাসকশ্রেণী পিছু হটল। ভাষা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করলাম।

স্বাধীনতার পর যা ঘটল তা হচ্ছে- ভাষার প্রতি আমাদের যে ভালোবাসা, সেই চেতনায় ব্যত্যয় ঘটল। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা তিন ধারায় বিভক্ত হয়ে পড়ল। একদিকে ইংরেজি মাধ্যমে ধনিক শ্রেণীর সন্তানদের শিক্ষা, আরেকদিকে দরিদ্রের সন্তানদের মাদ্রাসা শিক্ষা আর মধ্যবিত্তের সন্তানদের বাংলা মাধ্যমে শিক্ষাব্যবস্থা- এভাবে সমাজের শ্রেণীবিভাজনের বিষয়টা প্রশ্রয় পেল। মাতৃভাষার চেতনা যেখানে ঐক্য গড়ে ছিল, তিন ধারার শিক্ষার কারণে সেটি বিভক্ত হয়ে পড়ল।

ভাষার অন্তর্নিহিত আকাক্সক্ষা শ্রেণী ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে ঐক্য গড়ে তোলে। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে তিন ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা সরকারের শ্রেণীবিভাজনকে স্পষ্ট করে তুলল। একুশের চেতনার মধ্যে ভাষার জন্য ভালোবাসা যেমন ছিল, তেমন ছিল দেশপ্রেম। তেমনই তার গভীরে আরও একটি আকাক্সক্ষা ছিল- সমাজে শ্রেণীবিভাজন থাকবে না। সমাজে সাম্য এবং সমানাধিকার থাকবে। ভাষা কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি না, ভাষা কারও শ্রেণীগত মালিকানায় নয়, ধর্মীয় মালিকানার তো প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু তিন ধারার শিক্ষার কারণে ভাষার মাধ্যমে শ্রেণীবিভাজনের জন্ম ঘটল। এখন কথা হচ্ছে- এই শ্রেণীবিভাজনের দায়ী কে এবং কে এটাকে রক্ষা করছে? দায়ী হচ্ছে পুঁজিবাদ। যে ব্যবস্থাটা আমাদের এখানে শক্তিশালী হয় তা হচ্ছে পুঁজিবাদ। এটা আগেও ছিল। কিন্তু স্বাধীনতা-উত্তরকালে তার প্রভাব আরও বাড়ল। আর বিশ্ব পুঁজিবাদের ভাষা হিসেবে যেহেতু ইংরেজিই প্রাধান্য পায়, তাই আমাদের যারা বিত্তবান- পুঁজিবাদের প্রতিনিধি হিসেবে তারা ইংরেজির প্রতি ঝুঁকে পড়ল। তারা ইংরেজিকেই বেছে নিয়েছে। সমাজের ওপরতলার লোকেরা ইংরেজি ব্যবহারে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। তাতে তারা গৌরববোধ করছে। যেটা বাংলাদেশে ঘটছে তা হচ্ছে শ্রেণীবিভাজন বাড়ছে। যত উন্নয়ন হচ্ছে, তত শ্রেণীবিভাজন বাড়ছে। সেজন্য মাতৃভাষার চর্চা সমাজের ওপরতলায় রুদ্ধ হয়ে গেছে।

বর্তমানে বিশ্বে বাংলা ভাষীর সংখ্যা প্রায় পঞ্চম স্থানে জনসংখ্যার দিক থেকে। কিন্তু এই ভাষা কেন মর্যাদা পাচ্ছে না? মর্যাদা পাচ্ছে না এই কারণে যে, যারা এই ভাষার চর্চা করে, তারা নিজেদের মর্যাদা বাঁচাতে পারছে না এবং তারা নিজেদের মর্যাদা বৃদ্ধি করতে পারছে না। মর্যাদা বৃদ্ধির দুটি দিক আছে; প্রথমটি হচ্ছে- অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হতে হবে। দ্বিতীয় দিক হচ্ছে, তারা এই ভাষাটিকে সমৃদ্ধ করতে পারেননি। বাংলা ভাষার চর্চা মানে শুধু বাংলা ভাষার ব্যবহার নয়, বাংলা ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হবে। সমৃদ্ধ করতে হলে কী করতে হবে? এই ভাষায় জ্ঞানচর্চা করতে হবে এবং এই ভাষা যাতে জ্ঞানকে ধারণ করতে পারে, জ্ঞানকে প্রকাশ করতে পারে, তার ব্যবস্থা করতে হবে। এজন্য প্রচুর অনুবাদ দরকার হবে। বিশ্বের যত জ্ঞান আছে, যত সাহিত্য আছে, তা আমরা বাংলা ভাষার মধ্যে নিয়ে আসব। যার মাধ্যমে ভাষার ধারণক্ষমতা এবং প্রকাশ ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সেটি আমরা করতে পারছি না। অনুবাদ এখানে খুবই নিু পর্যায়ে আছে। তাতে মনোযোগই দেয়া হচ্ছে না। আর অন্যদিকে জ্ঞানের চর্চা হচ্ছে না। জ্ঞানের চর্চা অর্থাৎ গবেষণা এবং নতুন উদ্ভাবনা- সেটাও আমরা করছি না। যেটুকুওবা হচ্ছে, সেটা বাংলা ভাষায় প্রকাশ হচ্ছে না। ফলে বাংলা ভাষা সমৃদ্ধ হচ্ছে না। ভাষার সমৃদ্ধি নির্ভর করে যারা এই ভাষার চর্চা করে, সেই জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ওপর এবং এই ভাষা তারা কীভাবে চর্চা করছে তার ওপর। এটা তো অত্যন্ত লজ্জাজনক যে আমরা জনসংখ্যায় এত বেশি; কিন্তু আমরা সেই মর্যাদা পাচ্ছি না। জাতিসংঘের দাফতরিক ভাষা হিসেবেও আমরা মূল্যায়ন পাচ্ছি না। এই দাবি শুধু করলে হবে না, আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে বাংলা ভাষা সেই মর্যাদা পাওয়ার উপযুক্ত।

বাংলা ভাষার উন্নতি এবং আমাদের উন্নতি দুটিই অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। এই উন্নতি মানে কিছু লোকের উন্নতি নয়, সব মানুষের সর্বজনীন উন্নতি এবং সেই উন্নতি প্রতিফলিত হবে এবং প্রমাণিত হবে বাংলা ভাষার চর্চার মধ্য দিয়ে। ভাষার উন্নতি এবং জনগণের উন্নতি- এ দুটি অবিচ্ছিন্ন। বর্তমানে যে উন্নতি তা যে প্রকৃত উন্নতি হচ্ছে না বাংলাদেশে, এই উন্নতি যে কতিপয়ের উন্নতি এবং কৃত্রিম উন্নতি- সেটাই প্রতিফলিত হচ্ছে বাংলাচর্চার এই যে দীনতা, তার মধ্য দিয়ে। আমাদের এখন অনেক বই বেরোয় গ্রন্থমেলায়; কিন্তু অধিকাংশ বইয়ের ভেতরে কোনো উপাদান থাকে না, ভেতরের উপাদান খুব সামান্যই। কিন্তু মানুষের মধ্যে চাহিদা আছে- জ্ঞানের বই মানুষ চায়। সার্বিক বিচারে আমাদের করণীয় হচ্ছে- বাংলা ভাষার চর্চা করতে হবে। এই ভাষাকে সমৃদ্ধ করতে হবে। এই বাংলা ভাষার মাধ্যমেই জ্ঞানের সব শাখার চর্চাকে সফল করতে হবে।

অনুলিখন : শুচি সৈয়দ