ঢাকা, আজ বৃহস্পতিবার, ৩ ডিসেম্বর ২০২০

তামিম বীরত্বে শিরোপা কুমিল্লার

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০৯ ০৯:০১:০৮ || আপডেট: ২০১৯-০২-০৯ ০৯:০১:০৮

প্রজন্মের প্রতিনিধি হিসেবে এক নিঃশ্বাসে উচ্চারিত হয় তাঁদের নাম। ‘সাকিব-তামিম’ কিংবা ‘তামিম-সাকিব’। সেই সাকিব আল হাসান কাল চতুর্থ বিপিএল ফাইনাল খেলতে নামলেন। জাতীয় দলের ঘনিষ্ঠজন মাশরাফি বিন মর্তুজা তো এই টুর্নামেন্টের চারবারের শিরোপাজয়ী অধিনায়কই। অথচ তামিম ইকবাল কিনা কালই প্রথম খেলতে নামেন বিপিএল ফাইনাল!

আহ্, সে মুহূর্তটি কিভাবে রাঙিয়েই না দেন তিনি! ৬১ বলে অপরাজিত ১৪১ রানের ইনিংসে ক্রিকেট-মঞ্চে আঁকেন আগুনের আলপনা। ঢাকা ডায়নামাইটসকে ১৭ রানে হারিয়ে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের দ্বিতীয় বিপিএল শিরোপা জয়ের পথ তৈরি করে দেয় তামিমের ওই অপূর্ব ব্যাটিং।

নামেন তিনি ওপেনার হিসেবে। খেলেন ইনিংসের আদ্যন্ত। ৩১ বলে করেন প্রথম ফিফটি, পরের ৩০ বলে ৯১ রান! পরের অংশে তাঁর ব্যাটের রুদ্ররূপ বোঝানোর জন্য এই পরিসংখ্যানই যথেষ্ট। রুবেল হোসেনের এক ওভারে মারেন দুটি করে চার-ছক্কা। আন্দ্রে রাসেলকে ছক্কা মেরে পৌঁছান ৯৯-তে। এক বল পরই আরেক চারে বিপিএল ইতিহাসের নিজের প্রথম সেঞ্চুরির মাইলফলক স্পর্শ মাত্র ৫০ বলে। বুনো সৌন্দর্যে। রাজসিক আভিজাত্যে।

হ্যাঁ, কয়েকবার আউট হতে পারতেন বটে তামিম। ২৪ রানের সময় উইকেটরক্ষক তাঁর ক্যাচ ছেড়েছে। ৩৫ রানের সময় ওই ওপেনারের উড়িয়ে মারা বল আন্দ্রে রাসেল মুঠোবন্দি করলেও তা হাতে জমার আগে স্পর্শ করে মাটি। ৮০ রানের সময় উড়িয়ে মারা বল পড়ে তিন ফিল্ডারের মাঝে। পরের বলটি ব্যাটের কানায় লেগে স্লিপের ওপর দিয়ে যায় উড়ে। আউটের এসব অর্ধসুযোগগুলো থেকে বেঁচে অবিশ্বাস্য এক ইনিংস খেলেন তামিম। তাতেই প্রথম ১০ ওভারে ৭৩ রান করা কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস শেষ ১০ ওভারে তোলে ১২৬ রান। ২০ ওভারে তিন উইকেটে ১৯৯ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে তোলে ২০১৫ আসরের চ্যাম্পিয়নরা।

ব্যাটিংয়ের বিস্ফোরণেই নিজের দায়িত্ব শেষ বলে মনে করেননি তামিম। লং অন থেকে দৌড়ে ধরেন দারুণ দুটি ক্যাচও। আর সেগুলো কী মহাগুরুত্বপূর্ণ! মুখোমুখি হওয়া সাকিবের ১০ বলে ৩০ রান নেওয়া তামিম প্রতিপক্ষ অধিনায়কের ক্যাচ ধরেন লং অফ থেকে দৌড়ে মিড অনে গিয়ে। আর শেষ পাঁচ ওভারে যখন পাঁচ উইকেট হাতে নিয়ে ৫৯ রান দরকার ঢাকার, তখন কাইরন পোলার্ডের ক্যাচও ধরেন তামিম। বিপিএলের ট্রফি তখন অনেকাংশেই হেলে যায় কুমিল্লার দিকে।

২০০ রান তাড়া করায় যেমন শুরু দরকার, ঢাকা ডায়নামাইটসের ব্যাটিংয়ের শুরু মোটেই তেমন না। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই সুনীল নারিন রান আউট। পাওয়ার প্লে’তে দ্রুত রান তোলায় এই ক্যারিবিয়ানের ওপরই তো বরাবরের ভরসা ঢাকার। সেই নারিন আউট হয়ে যাওয়ার পরও যে প্রথম ছয় ওভারে ৭১ রান তুলবে, তা কে ভেবেছিলেন!

ঢাকা ডায়নামাইটসের এমন শুরু যাঁদের ব্যাটে, তা-ও অবাক করার মতো। কাইরন পোলার্ড, আন্দ্রে রাসেল নন, নন সাকিব আল হাসান—গতবারের রানার্স-আপদের লড়াইয়ে টিকিয়ে রাখে উপুল থারাঙ্গা ও রনি তালুকদারের ব্যাট। বিশেষত পরেরজনের আগ্রাসন বিস্ময়কর। মুখোমুখি হওয়া প্রথম চার বলে তাঁর এক রান। পঞ্চম বলে বাউন্ডারি মেরে পরের দিন বলে আবার এক রান। এ পর্যন্ত ঠিক আছে, এরপরই রনির ব্যাটে ছোটে আগুনের ফুলকি। মোহাম্মদ সাইফউদ্দিনকে এক ওভারে মেরে দেন একটি চার ও দুটি ছক্কা। মেহেদী হাসানকে পর পর দুই বলে চার-ছক্কা। সঞ্জিত সাহাকে লং অনের ওপারে আছড়ে ফেলেন। আর শহীদ আফ্রিদির বলে এক রান নিয়ে যখন ফিফটিতে পৌঁছান রনি, বলের ঘরে তখন মোটে ২৬।

অন্য প্রান্ত থেকে থারাঙ্গাও সঙ্গ দেন সমানতালে। চারটি চার এবং তিন ছক্কায় ফিফটির কাছাকাছি পৌঁছে যান তিনিও। কিন্তু আরেক শ্রীলঙ্কান থিসারা পেরেরার বলটিকে ভাসিয়ে লং অন পার করতে পারেন না। ২৭ বলে ৪৮ রানের দারুণ ইনিংসের সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে যায় দুর্দান্ত দ্বিতীয় উইকেট জুটি। ৫২ বলে ১০২ রানের এই জুটিতেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের ছুড়ে দেওয়া ২০০ রানের লক্ষ্যটাও তখন আর অসম্ভব মনে হয় না ঢাকা ডায়নামাইটসের কাছে।

৯ ওভারে দুই উইকেটে ১০২ রান করা ঢাকার জন্য শেষ ১১ ওভারে আট উইকেট হাতে নিয়ে প্রয়োজন ৯৮ রান। ফাইনাল জয়ের জন্য ফেভারিট তখন খানিকটা হলেও সাকিবের দল। কিন্তু সেখান থেকে একের পর এক উইকেট বিলিয়ে শিরোপাটি কুমিল্লার কাছে দিয়ে আসে ঢাকা।

সাকিব (৩) পরিস্থিতির দাবি মেটাতে পারেন না। সরাসরি থ্রোতে রান আউট রনি (৩৮ বলে ৬৬)। সাত ওভারে ৬৯ রান প্রয়োজন, এমন অবস্থায়ও রাসেল-পোলার্ডরা টেনে নিতে পারেন না ম্যাচ। রাসেল (৪) ক্যাচ দেন মিড অফে। আর ওয়াহাব রিয়াজের বলে পোলার্ডের (১৩) ক্যাচ যখন ধরেন তামিম, শিরোপার সঙ্গে এক ঝটকায় দূরত্ব অনেকখানি কমে আসে কুমিল্লার। শেষ দিকে টানা তিন ছক্কায় ম্যাচে খানিকটা উত্তেজনা আনার চেষ্টা করেন ঢাকার দুই ব্যাটসম্যান নুরুল হাসান ও মাহমুদুল হাসান। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে যায় বড্ড। তাঁদের ৯ উইকেটে ১৮২ রানে আটকে ১৭ রানে ম্যাচ জিতে নেয় কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানস।

জেতার অবস্থা থেকে ট্রফিটি কাল হারিয়ে এসেছে ঢাকা ডায়নামাইটস। সেই বোধকরি ভালো। ব্যাট হাতে কাল যেমন প্রলয়কাণ্ড ঘটিয়েছেন, ফিল্ডিংয়েও যেমন দুর্দান্ত দুটি ক্যাচ ধরেছেন—তাতে এই বিপিএল ট্রফিটা যে বড্ড বেশি প্রাপ্য তামিম ইকবালের! হয়তো কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের চেয়েও বেশি করে!