ঢাকা, আজ শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০

বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় অংশ শুরু

প্রকাশ: ২০১৯-০২-১৮ ০৯:৩৬:১৪ || আপডেট: ২০১৯-০২-১৮ ০৯:৩৬:১৪

ঠাণ্ডা কনকনে বাতাস আর মুষলধারে বৃষ্টি। ভিজে একাকার বিছানাপত্র, কাপড়-চোপড়। কাদাময় পথ চরম পিচ্ছিল। স্থানে স্থানে বাঁশে ঝুলছে চটের ছাদ। ময়দানে পানির স্রোত। এমনি বৈরী পরিস্থিতির মধ্যে রোববার শুরু হয়েছে বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় অংশ।

বাদ ফজর ভারতের মাওলানা মো. ইকবাল হাফিজের আম-বয়ানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় ইজতেমার দ্বিতীয় অংশের আনুষ্ঠানিকতা। এ বয়ান বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের মাওলানা আবদুল্লাহ মুনসুর। কাল সকাল ১০টায় আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে মুসলমানদের দ্বিতীয় বৃহত্তম এ সম্মেলনের ৫৪তম আয়োজন।

ভারতের মাওলানা সাদ কান্ধলভীকে নিয়ে বিভক্ত দাওয়াতে তাবলিগ। এবারের ইজতেমার প্রথম অংশ আয়োজন করেন মাওলানা মুহাম্মদ জোবায়েরপন্থী (সাদবিরোধী) মুরব্বিরা। শনিবার সকালে এ অংশের আখেরি মোনাজাতের পর মধ্যরাতে মাঠের নিয়ন্ত্রণ নেয় প্রশাসন। পরে মাঠ বুঝিয়ে দেয়া হয় সাদপন্থী মুরব্বিদের। তখন থেকে তাবলিগের সাদ সমর্থক ও সাধারণ মুসল্লিরা ময়দানে ঢুকতে শুরু করেন। বাদ ফজর ইজতেমার কার্যক্রম (আম-বয়ান)। বয়ান শুরু হওয়ার পরপরই বজ্রসহ শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ো বাতাস শুরু হলে দুর্ভোগে পড়েন মুসল্লিরা। প্রায় ২ ঘণ্টা চলে এ ঝড়-বৃষ্টি। এর মধ্যেই ভিজে-মুড়ে বয়ান শুনতে থাকেন মুসল্লিরা।

তবে বৈরী আবহাওয়ার কারণে মুসল্লিদের অনেকেই তখন পর্যন্ত ময়দানে ঢুকতে পারেননি। ঝড়বৃষ্টি থেমে গেলে ঢল নামে মানুষের। সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত মুসল্লিদের ময়দানে আসতে দেখা গেছে। রোববার দুপুর পর্যন্ত নতুন করে ১৫ দেশের ২শ’ মেহমান এসেছেন।

আয়োজকদের অন্যতম মুরব্বি মো. হারুন-অর রশিদ জানান, সম্মিলিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী শুক্রবার বাদ ফজর জোবায়েরপন্থীদের ইজতেমা (প্রথম অংশ) শুরু হওয়ার কথা। কিন্তু তারা একদিন আগে বৃহস্পতিবার বাদ আসর থেকেই বয়ান শুরু করেন। আবার শনিবার মোনাজাতের পর অব্যবহৃত জিনিসপত্র, উচ্ছিষ্ট খাবার ও আবর্জনা ফেলেই মাঠ ত্যাগ করেন। স্থানীয় প্রশাসন মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিলেও স্বল্প সময়ে প্রশাসনের পক্ষে মাঠের পুরো আবর্জনা সরানো সম্ভব হয়নি। এ পরিবেশের মধ্যে রোববার ফজরের সময় মুসল্লিরা মাঠে ঢোকেন। সকাল হতে না হতেই শুরু হয় বজ সহ বৃষ্টি।

হারুন-অর রশিদ আরও বলেন, মাঠ বুঝে নেয়ার পর বেশ কিছু মাইক, কোথাও পানির লাইন ও গ্যাস লাইনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন পাওয়া গেছে। ঝড়বৃষ্টিতে ক্ষতি হয় আরও কয়েক স্থানে। যতটুকু সম্ভব আমরা মেরামত করেছি। বাকিটা ঠিক করে দেয়ার জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। তারা ঠিক করছে। গাজীপুরের ভোগড়া থেকে ইজতেমায় যোগ দেয়া মো. সাইদুর রহমান জানান, সবকিছুই আল্লাহ থেকে হয়। বৃষ্টি-শীত একটা পরীক্ষামাত্র। এখানে যারা এসেছেন তারা আল্লাহ ও রাসূলকে রাজি-খুশি করার তালিম নিতে এসেছেন। কারও মধ্যে ইমানি শক্তি থাকলে দুনিয়াবি কষ্ট তার কাছে কোনো কষ্টই মনে হবে না।

গাজীপুরের জেলা প্রশাসক দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ুন কবীর জানান, শনিবার মধ্যরাতে ইজতেমা ময়দান সাদপন্থী মুরুব্বিদের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। মাঠে টুকটাক সমস্যা থাকলেও তা রোববার সকালেই সমাধান করা হয়েছে। তবে ইজতেমা এলাকায় আইনশৃঙ্খলাসহ সব ব্যবস্থাপনা আগের মতোই বহাল রয়েছে।

সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ আখেরি মোনাজাত হওয়ার কথা থাকলেও মাঠ পরিস্থিতি ও বৈরী আবহাওয়াসহ কয়েকটি কারণে ইজতেমার সময় ১ দিন বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন মুরব্বিরা। পরে এ বিষয়ে আবেদন করেন প্রশাসনের কাছে। ইজতেমার অন্যতম মুরুব্বি আশরাফ আলী বলেন, মাশোয়ারার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ইজতেমার আখেরি মোনাজাত মঙ্গলবার নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিন সকাল ১০টার দিকে আখেরি মোনাজাত হবে। গাজীপুর জেলা প্রশাসক ড. দেওয়ান মুহাম্মদ হুমায়ূন কবীর বলেন, তাদের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আখেরি মোনাজাত কাল হবে।

গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার ওয়াই এম বেলালুর রহমান জানান, ইজতেমায় আগত মুসল্লিদের সার্বিক নিরাপত্তা, যানজট নিরসনসহ সার্বিক বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করে যাচ্ছে। ইজতেমা শেষ না হওয়া পর্যন্ত এ ব্যবস্থা অব্যাহত থাকবে।

রোববার বয়ান করলেন যারা : বাদ ফজর ভারতের মাওলানা ইকবাল হাফিজ উর্দুতে বয়ান করেন, তা বাংলায় তরজমা করেন বাংলাদেশের আবদুল্লাহ মুনসুর। বাদ জোহর বয়ান করেন নিজামুদ্দিন মারকাজের মুরব্বি মাওলানা আবদুল বারী। বাংলায় তরজমা করেন মাওলানা মুনির বিন ইউসুফ। বাদ আসর বাংলাদেশের মাওলানা মোশাররফ হোসেন। বাদ মাগরিব বয়ান করেন দিল্লির মাওলানা শামীম আহমদ। অনুবাদ করেন বাংলাদেশের মাওলানা আশরাফ আলী।

মুসল্লিদের অবস্থান : ৮৪ খিত্তায় অবস্থান করছেন মুসল্লিরা। এর মধ্যে মিরপুর (খিত্তানং ১ ও ২), সাভার (৩ ও ৪) টঙ্গী (৫), উত্তরা (৬ ও ৭), কাকরাইল (৮-১৪), মোহাম্মদপুর (১৫), যাত্রাবাড়ী (১৬), ডেমরা (১৭), কেরানীগঞ্জ (১৮ ও ১৯), ধামরাই (২০), নবাবগঞ্জ ও দোহার (২১), টাঙ্গাইল (২২), মানিকগঞ্জ (২৩), নারায়ণগঞ্জ (২৪), নরসিংদী (২৫), গাজীপুর (২৬), মুন্সীগঞ্জ (২৭), কিশোরগঞ্জ (২৮), ফরিদপুর (২৯), রাজবাড়ী (৩০), শরীয়তপুর (৩১), মাদারীপুর (৩২), গোপালগঞ্জ (৩৩), নওগাঁ (৩৪), চাঁপাইনবাবগঞ্জ (৩৫), জয়পুরহাট (৩৬), নাটোর (৩৭), বগুড়া (৩৮), পাবনা (৩৯), সিরাজগঞ্জ (৪০), রাজশাহী (৪১), ময়মনসিংহ (৪২), নেত্রকোনা (৪৩), সুনামগঞ্জ (৪৪), সিলেট (৪৫), হবিগঞ্জ (৪৬), মৌলভীবাজার (৪৭), চট্টগ্রাম (৪৮), লক্ষ্মীপুর (৪৯), বান্দরবান (৫০), রাঙ্গামাটি (৫১), খাগড়াছড়ি (৫২), কক্সবাজার (৫৩), নোয়াখালী (৫৪), ফেনী (৫৫), বি. বাড়িয়া (৫৬), কুমিল্লা (৫৭), মাগুড়া (৫৮), শেরপুর (৫৯), জামালপুর (৬০), যশোর (৬১), চাঁদপুর (৬২), সাতক্ষীরা (৬৩), নড়াইল (৬৪), ঝিনাইদহ (৬৫), বাগেরহাট (৬৬), মেহেরপুর (৬৭), খুলনা (৬৮), চুয়াডাঙ্গা (৬৯), কুষ্টিয়া (৭০), রংপুর (৭১), দিনাজপুর (৭২), লালমনিরহাট (৭৩), নীলফামারী (৭৪), পঞ্চগড় (৭৫), কুড়িগ্রাম (৭৬), ঠাকুরগাঁও (৭৭), গাইবান্ধা (৭৮), পটুয়াখালী (৭৯), ঝালকাঠি (৮০), ভোলা (৮১), বরিশাল (৮২), বরগুনা (৮৩) ও পিরোজপুর জেলার মুসল্লিরা ৮৪নং খিত্তায় অবস্থান করবেন।

ট্রেন সার্ভিস : টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা মো. হালিমুজ্জামান জানান, আখেরি মোনাজাতের দিন মুসল্লিদের সুষ্ঠুভাবে যাতায়াতের জন্য ১১ জোড়া বিশেষ ট্রেনসহ ১২০টি ট্রেন টঙ্গীতে যাত্রাবিরতি করবে।

যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা : পুলিশ জানিয়েছে, আখেরি মোনাজাতে মুসল্লিদের যাতায়াতের সুবিধার্থে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যান চলাচলে গাজীপুর ট্রাফিক পুলিশের পক্ষ থেকে বিশেষ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। আজ মধ্যরাত থেকে কাল রাত ৮টা পর্যন্ত আবদুল্লাহপুর থেকে ভোগড়া বাইপাস এবং মীরের বাজার থেকে টঙ্গী স্টেশন রোড পর্যন্ত উভয়মুখী রাস্তায় সব প্রকার যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকবে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন সূত্র জানায়, সিটি মেয়র মো. জাহাঙ্গীর আলম ২ দিনের লাখো মুসল্লির ফেলে যাওয়া আবর্জনা পরিষ্কারসহ পানি, গ্যাস এবং পয়ঃনিষ্কাশন সমস্যার সমাধানে কর্পোরেশনের লোকজনকে নির্দেশ দিয়েছেন। পানি উত্তোলনের জন্য ৩২টি মোটর এবং গ্যাস সংযোগের ব্যবস্থা করেন। তিনি ময়দানে গিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন।