ঢাকা, আজ শুক্রবার, ৪ ডিসেম্বর ২০২০

ডাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

প্রকাশ: ২০১৯-০৩-০১ ১০:০৮:৫২ || আপডেট: ২০১৯-০৩-০২ ১১:৪৩:১০

বহু বছর ডাকসু নির্বাচন না হওয়া নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে এক ধরনের অসন্তোষ বিরাজ করছিল। এবার মাননীয় উপাচার্যের একান্ত প্রচেষ্টায় সেই নির্বাচন হতে চলেছে।

নির্বাচনকে ঘিরে ছাত্রদের মধ্যে সুখানুভূতির উত্তেজনা বিরাজ করছে। ডাকসু কী এবং এর কাজ কী, বর্তমানে ডাকসুর কোন ভূমিকা প্রত্যাশা করে শিক্ষার্থীরা? নির্বাচনের আগে এসব বিষয়ে আলোকপাত করা যাক।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ

ডাকসুর পূর্ণরূপ- Dhaka University Central Students’ Union (DUCSU)। বাংলাদেশের ইতিহাসে দুটি বড় ঘটনা হল ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ। এ দুই মহান অর্জনসহ দেশের রাজনীতিতে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে, সন্দেহাতীতভাবে তা হল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এ সম্পৃক্ততার কারণ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের দেশ-জাতি-রাজনীতি সচেতনতা। ১৯২১ সালে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার অব্যবহিত পরেই ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সংগঠন হিসেবে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময়ে এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হতে হতো ছাত্রদের। ছাত্র অধিকার সংরক্ষণে একটি অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে এর যাত্রা শুরু হলেও সূচনালগ্ন থেকেই অবধারিতভাবে এটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাকালীন তিনটি হলের (ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল) প্রতিটি থেকে উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি নিয়ে সংসদ গঠিত হতো। ১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীকালে তা নির্বাহী পরিষদে অনুমোদিত হয়ে কার্যকর হয়। ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ’ রাখা হয়। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী মাননীয় উপাচার্যকে ডাকসুর সভাপতি হিসেবে রাখা হয়। ওই বছরই প্রথম সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যকে সভাপতি ও একজন শিক্ষককে কোষাধ্যক্ষ হিসেবে রেখে ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি ও ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়েছিল। তবে শিক্ষার্থীদের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচন ব্যবস্থা চালু হয় ১৯৭০ সালে। সর্বশেষ ডাকসু নির্বাচন হয়েছিল ১৯৯০ সালে। এ পর্যন্ত মোট সাতবার ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথম ভিপি ও জিএস ছিলেন যথাক্রমে মমতাজউদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত। প্রথম নির্বাচিত ভিপি ছিলেন এসএ বারী। ছাত্রলীগ থেকে নির্বাচিত প্রথম ভিপি ছিলেন শ্যামা প্রসাদ ঘোষ ও জিএস ছিলেন কেএম ওবায়েদুর রহমান (১৯৬২-৬৩)।

ডাকসুর অবদান

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা দেশের রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ছিল সবসময়ই। দেশের সব সংকটে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এগিয়ে এসে সাহসে বুক চিতিয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশপ্রেমের শিক্ষা তারা এ অঙ্গনে পা রাখার ক্ষণ থেকেই গ্রহণ করে নেয়। বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের অবদানকে বাদ দিয়ে কোনো ইতিহাসই সম্পূর্ণ নয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের যে কোনো সংকটে এ ঐক্যবদ্ধ অবস্থানের ভিত্তি ছিল ডাকসু। সরল অথচ একান্ত সত্য কথা হল, ডাকসু ছিল ছাত্রদের প্রাণের সংগঠন। রাজনীতিতে এ সংগঠনের অবদান ’৫২, ’৬২, ’৬৬, ’৬৯, ’৭১- সব ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় পতাকা প্রথম উত্তোলন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ, সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের তথা ডাকসুর অবদান। ইতিহাসে এসব অবদানের কথা স্বীকৃত। কিন্তু এর পাশাপাশি সাধারণ ছাত্রদের নিত্যনৈমিত্তিক প্রয়োজন মেটাতে ডাকসু যে ছাত্রদের আস্থার প্রতীক ছিল, সে কথা হয়তো ইতিহাসে লেখা নেই। তবে এ অবদানের কথা কৃতজ্ঞতাভরে স্বীকার করেন সাবেক শিক্ষার্থীরা। ডাকসু ছাত্রদের যে কোনো প্রয়োজনে, দেশের যে কোনো সংকটে সবসময়ই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে এ ছাত্ররাই প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। প্রতিবাদের সূচনা হয়েছিল এই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। ডাকসু সক্রিয় থাকলে এই কৃতিত্বও তারই হতো। ডাকসু সচল থাকলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে কোনো অরাজকতা হয়তো সৃষ্টি হতে পারত না। সাধারণ ছাত্রদের এত ভোগান্তি হতো না। উপাচার্য মহোদয় ছাত্রদের কথা চিন্তা করে তাই ডাকসু নির্বাচন দিয়ে ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ করতে সচেষ্ট হয়েছেন।

এ নির্বাচনে ছাত্রসমাজের প্রত্যাশা কী

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা সময়ের ডাকে সাড়া দিতে জানে। ইতিহাস তার সাক্ষী। কিন্তু অতীতের প্রেক্ষাপট বর্তমান সময় থেকে অনেক ভিন্ন ছিল। দেশ যখন পরাধীনতার শৃঙ্খলে বন্দি, তখন সেই শৃঙ্খলমুক্তিই ছাত্রদের কর্তব্য হয়ে উঠেছিল। দেশ যখন স্বৈরাচারীর হাতের পুতুল, তখন সে হাত অচল করে দেয়াকেই তারা কর্তব্য মনে করেছে। সাধারণ ছাত্ররা এ ক্ষেত্রে ডাকসুর কাছে এসব আন্দোলনে শামিল হওয়ার প্রত্যাশা করেছে। সে সময়ে ডাকসু সে প্রয়োজন মিটিয়েছে। কিন্তু এ সময়ে এসে ছাত্রদের প্রত্যাশা কী? বর্তমান সময়ে ক্যাম্পাসের সুশৃঙ্খল পরিবেশই সবচেয়ে বেশি কাম্য ছাত্রদের কাছে। তারা চায় সুষ্ঠু রাজনৈতিক পরিবেশ বজায় থাকুক। উন্নয়নের পথে বিপত্তি না আসুক। বিশেষ করে তারা চায় স্বাধীনভাবে জ্ঞান বিকাশের সুযোগ। অন্যদিকে, তারা দ্বিধাহীন-ভীতিহীন আবাসন ব্যবস্থা প্রত্যাশা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে খাবারের মান নেমে গেছে ব্যাপকভাবে। সাধারণ ছাত্ররা স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের নিশ্চয়তা চায়। তাদের এই সামান্য দাবিটুকু মেটানো এখন একটি বড় চ্যালেঞ্জ। যে ছাত্র সংগঠন এই প্রত্যাশাগুলো পূরণে অবদান রাখতে পারবে, ছাত্ররা তাদেরকেই বরণ করে নেবে।

সঞ্জয় বিক্রম : প্রভাষক, বাংলা বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়