ঢাকা, আজ সোমবার, ৩০ নভেম্বর ২০২০

কলকাতায় কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজও আছে

প্রকাশ: ২০১৯-০২-০২ ১১:৩০:৪২ || আপডেট: ২০১৯-০২-০২ ১১:৩০:৫২

কলকাতায় নেমেই ছুটলাম বইপাড়ায়, কলেজ স্ট্রিটে। গন্তব্য কফি হাউস। আর কফি হাউস মানেই মান্না দের বিখ্যাত সেই গান আর কলকাতার বহুল পরিচিত সাহিত্যের পাতায় পাতায় স্থান পাওয়া কফির কাপে ধোঁয়া তোলা একদল উচ্ছল তরুণ-তরুণী। মাথার ভেতর গুন গুন করে বেজে চলেছে মান্না দের ‘কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই…আজ আর নেই…।’

২৩ জানুয়ারি, সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকী। ফুলে–ফেস্টুনে শহর সাজানো; যদিও ঢাকার বিশেষ দিবসগুলোর মতো মাইকের আওয়াজ নেই।

বেশ কিছুক্ষণ ধরে ট্যাক্সি দাঁড়িয়ে। সামনে শোভাযাত্রা। তার সামনে ট্রাম। গদাই লস্করি চালে চলে ট্রাম, তার পেছনে ধীরপায়ে এগোয় মিছিল।

বিহারি ট্যাক্সিচালক বিহারি–হিন্দিতে মিশিয়ে যা বলল, তা দাঁড়াল, ‘আপনি এখানেই নামুন, ম্যাডাম। দুই মিনিট হাঁটলেই হাতের ডান দিকে কফি হাউস।’

কফি হাউসে অফিসফেরত দুই বন্ধুর আড্ডা। ছবি: ফারজানা লিয়াকত

ঠিক সেই মুহূর্তে আমার চোখের সামনে যে মধুর সুদর্শন চেহারা ভেসে উঠল, তা হলো বাংলাদেশের সিএনজিচালিত অটোরিকশা কিংবা ট্যাক্সির ড্রাইভার। দু-একজন ব্যতিক্রম ছাড়া প্রায় সবাই আপনাকে আপনার গন্তব্যের চৌকাঠে নামিয়ে দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে দাঁড়িয়ে থাকবে।কফি হাউসে অফিসফেরত দুই বন্ধুর আড্ডা। লিয়াকত বিরক্তি নিয়ে নেমে পড়লাম। দাঁড়িয়ে আছি প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে। নতুন–পুরোনোর মিশেলে অদ্ভুত সুন্দর এক স্থাপত্য। ফটকের পকেট গেটটির দিকে তাকিয়ে মনে এল, এই দরজা দিয়ে কত দিন না জানি সুভাষচন্দ্র বসু, জগদীশচন্দ্র বসু, অমর্ত্য সেন বা সত্যজিৎ রায়রা আসা–যাওয়া করেছেন। এই রাস্তায় হেঁটেছেন।

ট্যাক্সিচালকের কথামতো দুই মিনিট হাঁটতেই চোখে পড়ল কফি হাউস। ব্র্যাকেটে ‘আলবার্ট হল’ লেখা এখনো মুছে যায়নি। ছুটির দিন হওয়ায় বেশির ভাগ বইয়ের দোকান বন্ধ। রাস্তায় পুরোনো বইয়ের স্টলগুলো বসেছে। কফি হাউসে ঢোকার আগে সেগুলো নেড়েচেড়ে দেখছিলাম। চামড়ায়–রেক্সিনে বাঁধানো বইগুলো কারা বিক্রি করে দেয়? মায়া হয় না তাদের?

কফি হাউসে ঢোকার আগে ফুটপাতের স্টলে সাজিয়ে রাখা সারি সারি পুরোনো বইগুলোয় চোখ বুলিয়ে নিলাম। তখনো মাথার ভেতর মান্না দের গান। কফি হাউসের যত কাছাকাছি যাচ্ছি, ততই এক সুখানুভূতি মন ছেয়ে থাকছে।

হঠাৎ পেছন থেকে কেউ একজন ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘কফি হাউসটা কোন দিকে?’ তাকিয়ে দেখলাম, হিপি। টি–শার্টে পর্তুগালের পতাকা। হয়তো ইংরেজি–বাংলা কোনোটা পড়তে পারে না, তাই কফি হাউসের ঠিক সামনে দাঁড়িয়েও তা খুঁজে পাচ্ছে না।

দেখিয়ে দিতেই সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেল। আমি মনে মনে ভাবলাম, ‘যাক, পর্তুগিজ এসে হাজির হয়েছে যখন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দু-একটা ভূত এসে পড়লেও অবাক হওয়ার কিছু নেই!’

করিডরে শেষ বিকেলের আড্ডা। ছবি: ফারজানা লিয়াকত

সিঁড়িতে পা রেখেই মনটা ভালো হয়ে গেল। চিটচিটে ময়লা সিঁড়ি, ধুলোয়–দাগে দেয়ালের আসল রং ঠাওর করা যায় না। যে ধুলোবালু এমনিতে অসহ্য লাগে, কফি হাউসে এসে এর বিবর্ণ সিঁড়ি আর দেয়াল সবই যেন আপন মনে হচ্ছে। এসবই যেন কফি হাউসের নিজস্বতা। কফি হাউস তো এমনই হওয়ার কথা। চাকচিক্য, ধোপদুরস্ত চেহারা কি কফি হাউসকে মানায়? তাই তো ধুলো, দাগ, পড়ে থাকা সিগারেটের ফিল্টার, এমনকি সিঁড়িতে ভিক্ষা চাওয়া কিশোরীটিকেও আপন লাগে। ঝাঁ–চকচকে প্রিমিয়াম কফি শপে এ রকম আপন আপন ব্যাপারগুলো কোথায়?করিডরে শেষ বিকেলের আড্ডা।

সিঁড়ির দেয়ালে স্লোগান আর হাতে আঁকা ছবি। আছে কিছু টেরাকোটার কাজও।

ভেতরে ঢুকতেই কানে এল অসংখ্য মানুষের একসঙ্গে কথা বলার আওয়াজ। যেন এরা মানুষ নয়; একঝাঁক অপরিচিত শীতের পাখি। এক জায়গায় এসে কিচিরমিচির করছে। যে যার সঙ্গে রয়েছে, সে ছাড়া কেউ কারও কথা বুঝতে পারারই কথা নয়। অভিজাত রেস্তোরাঁর মতো ফিসফিসিয়ে কথা বলার বালাই নেই। সবাই গলা উঁচু করে যার যার মতো করে কথা বলে চলছে। ফাঁকে চলছে ভাজাভাজি মুখে পোরা আর কফির কাপে চুমুক দেওয়া। ধূমপানেও সেখানে বাধা নেই। তাই দেদার চলছে ধূমপানও।

মেঝে থেকে সিলিংয়ের দূরত্ব দেখেই বোঝা যায় বাড়িটার বয়স। মাঝখানের দেয়ালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের এক বিশাল প্রতিকৃতি।

কফি হাউসের বাড়িটা প্রথমে বাঙালি দার্শনিক কেশব চন্দ্র সেনের বসতবাড়ি ছিল। পরে ১৮৭৬ সালে প্রিন্স আলবার্টের নামে এর নাম দেওয়া হয় আলবার্ট হল। ১৯৪২ সালে সরকারি উদ্যোগে আলবার্ট হল হয়ে যায় কফি হাউস, আরও পরে ইন্ডিয়ান কফি হাউস।

বড় বড় কাঠের জানালা। শীত শেষের দমকা হাওয়া ঝাপটা মারে। ভেতরে আলো-আঁধারির খেলা। কোথাও শেষ বিকেলের আলো উঁকি দিচ্ছে তো কোথাও জ্বলছে বৈদ্যুতিক বাতি। নিচের হলঘরে সারি সারি টেবিল সাজানো, ঠিক যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি ক্যানটিন কিংবা মধুর ক্যানটিন। ওপরে লম্বা করিডর। সরু করিডরে এক লাইন করে টেবিল বসানো। বড় টেবিলে দল বেঁধে আড্ডা দিতে আসা বন্ধুরা। আর ছোট টেবিলে দুই বন্ধু অথবা প্রেমিক যুগল। বিকেল সাড়ে চারটার সময়েই হাউসফুল। বসার জায়গা নেই। অগত্যা অপেক্ষা করতে হলো, কখন খালি হবে একটা চেয়ার!

তেলেভাজা, আদা–চা আর কফির গন্ধ মিলেমিশে সুগন্ধের খিচুড়ি পেকেছে ভেতরে।

১৫ থেকে ২০ মিনিট অপেক্ষার পর বসার জায়গা পাওয়া গেল। করিডর ধরে টেবিলের মাঝখান দিয়ে হাঁটার সময় মনে মনে ভাবছিলাম, ওই কোনার টেবিলটায় কি ঝাঁকড়া চুলে, মোটা চশমায় চোখ লুকিয়ে নিজের নীল ডায়েরির পাতায় কবিতা লিখেছেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়? লম্বাটে টেবিলটায় কি ব্রিটিশ হটাও আন্দোলনে স্বদেশি নেতারা মিটিং করেছিল?

কফি হাউসে প্রতিদিন এভাবেই চলছে আড্ডা। এ আড্ডা শেষ হওয়ার নয়। ছবি: ফারজানা লিয়াকত

যে টেবিলে বসলাম, তার কোনায় ধারালো কিছু দিয়ে লেখা ইংরেজি ‘এম’। উল্টো ‘ডব্লিউ’ও হতে পারে। আমার মনে পড়ল মান্না দের গানের লাইন, ‘মইদুল ঢাকাতে’। তবে কি মইদুলেরই কোনো স্মৃতিকাতর বন্ধু সে চলে যাওয়ার পর টেবিলে আনমনে লিখে রেখেছে নামের আদ্যক্ষর? মইদুল কি জানতে পেরেছিল কোনো দিন এ কথা?কফি হাউসে প্রতিদিন এভাবেই চলছে আড্ডা। এ আড্ডা শেষ হওয়ার নয়। ছবি: ফারজানা লিয়াকতসময়ের সঙ্গে বদলে গেছে কলকাতা। অনেক রাস্তায় তুলে দেওয়া হয়েছে ট্রাম। ব্যস্ত নাগরিক জীবনে বুড়ো ট্রামের ধীরগতির আদর নেই এখন। এককালের রাজধানী কলকাতার জায়গা করে নিয়েছে দিল্লি। বদল হয়েছে কফি হাউসের খাবারের মেন্যুতেও। কফি হাউসের একজন সদস্য, বিজয়, জানালেন, মেন্যুতে চায়নিজ খাবার যোগ হয়েছে পরে। চা, কফি, চিকেন স্যান্ডউইচের পাশাপাশি আছে নুডলস ও ফ্রায়েড রাইস। কাঠের চেয়ারের জায়গা নিয়েছে প্লাস্টিকের চেয়ার।

বদলায়নি আড্ডা। কফি হাউসের পুরোনো স্লোগান—‘আড্ডা চলছে, চলবে’—এখন নতুন মাত্রা পেয়েছে। সময়ের সঙ্গে আড্ডার মানুষগুলো শুধু পাল্টেছে। এখানে একটা কফি নিয়ে যতক্ষণ খুশি বসে থাকা যায়, গল্প করা যায়। ওয়েটার বাঁকা চোখে তাকায় না, খাবার ফরমাশ করতে তাড়াও দেয় না।

কফি হাউসে সব মিলিয়ে ৮০ জন কর্মচারী। প্রতিদিন গড়ে দেড় হাজার অতিথি সামলান তাঁরা। সাদা রঙের ইউনিফর্মে পরিপাটি উপস্থাপন।

চারদিকে চোখ বুলালে অবাক হতে হয়। সতেরো–আঠারো বছরের তরুণ থেকে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি, অতিথির তালিকায় কেউ বাদ নেই। তাঁদের কেউ কেউ পুরোনো প্রেসিডেন্সি কিংবা হিন্দু কলেজের ছাত্র, যাঁদের যৌবন কেটেছে এই কফি হাউসে, কলেজ স্ট্রিটের বইপাড়ায়।

এই কফি হাউস শুধু ১৭ টাকার কফি অথবা ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপের জন্য জনপ্রিয় নয়; এ এক বুদ্ধিজীবী মিলনমেলা। এখানে রোজ আড্ডার ছলে জন্ম নেয় নতুন মতাদর্শ, নতুন তত্ত্ব, নতুন জীবনদর্শন।

এখানে ফেসবুকে চেক-ইন দেওয়ার তাড়া নেই। বাঙালি–অবাঙালি খাবারের মিশ্র গন্ধে গা গুলায় না, বরং ভালো লাগে। এখানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আদিখ্যেতা এখনো পৌঁছায়নি। এখানে বন্ধু বন্ধুর কথা শোনে, গা ছুঁয়ে থাকে।

এ এক নিরন্তর ভালো লাগা, ভালোবাসার গল্প। কফি হাউসের কফির সৌরভে ভেসে বেড়াচ্ছে নতুন-পুরোনো সব ভালোবাসা।